প্রথমবারের মতো রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলার জন্য ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন দেশটির বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসিসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমাদের কাছে তাদের সরবরাহকৃত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালানোর অনুমতি চেয়ে আসছিল। তবে বৃহৎ পরিসরে যুদ্ধ এড়াতে ইউক্রেনকে এসব অস্ত্র কেবল নিজেদের সীমান্তের ভেতরে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের মেয়াদের মাত্র দুই মাস আগে বাইডেনের এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে জেলেনস্কি রবিবার রাতে তার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ভাষণে তিনি বলেন, এসব ব্যাপারে ঘোষণা দিতে হয় না। ক্ষেপণাস্ত্র নিজেই কথা বলবে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়ার সেনা নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগের জবাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে পেন্টাগন। নিজেদের বাহিনীর সম্পূরক শক্তি হিসেবে সম্প্রতি রণক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েন করেছে রাশিয়া। এটি নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভ উভয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের দেয়া অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার গভীরে হামলা চালানোর অনুমতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এরই মধ্যে ইউক্রেন সামনের দিনগুলোতে দূরপাল্লার হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে। তবে অভিযান-সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তারা এ হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আর্মি টেকনিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) নামে পরিচিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে প্রথম হামলা চালানো হতে পারে কিয়েভ। এসব ক্ষেপণাস্ত্র তিনশো কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সৈন্য সমাবেশ, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম, সরবরাহ কেন্দ্র, গোলাবারুদের গুদাম এবং রাশিয়ার গভীরে থাকা সরবরাহ লাইন ধ্বংস করতে পারে ইউক্রেন। এতে রাশিয়ার পালটা আক্রমণের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়বে। রাশিয়ার গভীরের হামলা চালানোর অনুমতি যুদ্ধের গতিপথ কতটা বদলাতে পারবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও এ সিদ্ধান্ত রুশ সেনাদের ভূখণ্ড দখলের চলমান সময়টাতে ইউক্রেনকে সহায়তা করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হলে তা দর-কষাকষিতে কিয়েভকে ভালো অবস্থানে রাখবে।
তবে ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর বাইডেনের এই সিদ্ধান্তের ভবিস্যৎ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে দেওয়া আর্থিক ও সামরিক সহায়তার সমালোচনা করে আসছেন তিনি। আগামী ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো। জার্মান গবেষণা সংস্থা কিয়েল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির হিসাবে, যুদ্ধের শুরু থেকে গত জুনের শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৫৫.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে বা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাশিয়া। বাইডেন প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালছে বলে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। গতকাল সোমবার ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার ভূখন্ডের গভীরে ছোড়া হলে মস্কো একে ইউক্রেনের হামলা নয়, বরং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে হামলা বলে গণ্য করবে।
এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন রুশ আইনপ্রণেতারা। রুশ আইনপ্রণেতা মারিয়া বুটিনা বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতা ছাড়ার আগে যুদ্ধের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার ফেডারেশন কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ সদস্য আন্দ্রে ক্লিশাস বলেছেন, এই উত্তেজনা ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দ্যুমার নিম্নকক্ষের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান লিওনিড সøুটস্কি বলেছেন, ইউক্রেনকে এটিএসিএমএস রকেট দিয়ে রাশিয়ায় হামলার অনুমোদনের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।

