অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিনই নেই, শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের বিরুদ্ধে!
চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন, আন্ডার রেটে বাজারজাতকরণ, শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং চাঁদাবাজির মামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিনের অস্তিত্বই মেলেনি!
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির এক পরীক্ষায় এলবিয়নের উৎপাদিত ‘মিমক্স ৫০০ মি.গ্রা.’ (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
ল্যাব পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যাচ নম্বর ০১১২১২-এর ক্যাপসুলে ছিল অজানা সাদা দানাদার পাউডার, যার গড় ওজন ৩৯০.২ মিলিগ্রাম। পরীক্ষার প্রতিবেদনে ওষুধটিকে ‘মানবহির্ভূত’ উল্লেখ করে বলা হয়, এতে অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি।
একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলেও ঘোষিত মাত্রার তুলনায় ওষুধের কার্যকর উপাদানের ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদাবাজির মামলায় চেয়ারম্যান-এমডিসহ তিন কর্মকর্তা এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা মো. নিজাম উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে মামলা হয়েছে।
কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর ১৫১/২৩ অনুযায়ী, ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান অভিযোগ করেন, তার কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।
তদন্তে দেখা গেছে, এলবিয়নের বেশ কয়েকটি ওষুধ বাজারে অন্যান্য শীর্ষ কোম্পানির তুলনায় অস্বাভাবিক কম পাইকারি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে যেখানে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাইকারি মূল্য তিন হাজার টাকার বেশি, সেখানে এলবিয়নের একই ধরনের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের এই বিশাল ব্যবধান ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
এলবিয়নের বেশ কয়েকটি ওষুধের লেবেলে উল্লেখিত মূল্য এবং পাইকারি বাজারের প্রকৃত মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই মূল্য ব্যবধানের কারণে ভ্যাট ও কর পরিশোধের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে। ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া এক অভিযোগে বলা হয়, পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার আমদানি তথ্য এবং ৪৯২ কোটি ২০ লাখ টাকার বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে-বেনামে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, বিলাসবহুল গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের তথ্য গোপনের অভিযোগও রয়েছে।
মানহীন ও নকল ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগে এর আগে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকায় অবস্থিত এলবিয়নের একটি কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করেছিল। পরবর্তীতে ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার রহমতনগর এলাকায় অবস্থিত।
নতুন করে নমুনা পরীক্ষা করছে ঔষধ প্রশাসন
অভিযোগের বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এলবিয়নের মানবদেহ ও ভেটেরিনারি ব্যবহারের ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন কে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেন নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, জিএমপি নীতিমালা লঙ্ঘন, পশু ও মানুষের ওষুধ একই ভবনে উৎপাদনের অভিযোগ এবং সন্দেহজনক দামে বাজারজাতকরণের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

