সোমবার, এপ্রিল ২৭, ২০২৬
নেপথ্যে ডিপিএইচই’র কর্মচারী আনোয়ার

কক্সবাজারে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে প্রক্সি পরীক্ষায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ

রাকিব উদ্দিন
- Advertisement -bsrm

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা–২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক উভয় ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে একাধিক প্রার্থী নিয়োগ পেয়েছেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এই অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মেকানিক পদে কর্মরত। অতীতেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শাস্তি ও কারাভোগের নজির রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার ৪নং সাবরাং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আব্দুর রহিম ও সাইরা বানু দম্পতির ছেলে আমান উল্লাহ নাহিন (৩১) সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ধাপে নিজে অংশগ্রহণ করেননি। তার রোল নম্বর ছিল ৪৬২১০৬৫।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) তিনি কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চূড়ান্ত নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দিতে আসবেন। প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সেদিন সরেজমিনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপস্থিত হন প্রতিবেদক। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর জানা যায়, তিনি কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার সনদ ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গেছেন। সেখানে গিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে তার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়।

লিখিত পরীক্ষায় নিজে অংশগ্রহণ না করে কীভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি উচ্চস্বরে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে পরবর্তীতে কৌশলী আলাপচারিতার একপর্যায়ে স্বীকার করেন যে, তার হয়ে অন্য একজন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।SIBL

তিনি দাবি করেন, হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মচারী এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বড় ভাই আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে পুরো প্রক্সি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আনোয়ার হোসেন ‘প্রক্সি ডন’ ও ‘ডিভাইস ডন’ নামে পরিচিত ছিলেন। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

আলাপের একপর্যায়ে আমান উল্লাহ নাহিন অভিযোগ করেন, চুক্তি অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক, দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ করানোর কথা থাকলেও ৪ লাখ টাকা পরিশোধে দেরি হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষায় আনোয়ার তাকে সহযোগিতা করেননি। পরবর্তীতে তিনি নিজ উদ্যোগে ভাইভা বোর্ডের একজনকে ‘ম্যানেজ’ করে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন বলে দাবি করেন।

ভাইভা বোর্ডে কাকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের হাত ধরে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তার বক্তব্য, “এটা প্রকাশ হলে আমার পুরো জীবন শেষ হয়ে যাবে।” তিনি আরও দাবি করেন, আনোয়ার তার একাডেমিক সার্টিফিকেটের মূল কপি জিম্মি করে রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে তা ফেরত নেন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, লিখিত পরীক্ষায় আমান উল্লাহ নাহিনের হয়ে অংশ নেওয়ার জন্য আনোয়ার হোসেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ৩ লাখ টাকার চুক্তি করেন। ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তার বাড়িও কক্সবাজার জেলায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন মিয়া বলেন, “এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আমার জানা নেই। কীভাবে প্রক্সি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং কারা জড়িত, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

একই বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আ. মান্নান বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। প্রক্সির মাধ্যমে কেউ সরকারি চাকরি করতে পারবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা হবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

অভিযুক্ত আমান উল্লাহ নাহিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তি, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্য এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, ছাত্রজীবনে তিনি উশৃঙ্খল আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবন ও পাচার চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে তারা জানান।

আনোয়ার হোসেন সম্পর্কে অনুসন্ধানে পাঁচজন শিক্ষিত যুবকের বক্তব্য পাওয়া গেছে, যারা বিভিন্ন সরকারি চাকরির প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় ৩–৪ লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি অর্থের বিনিময়ে প্রক্সির মাধ্যমে উত্তীর্ণ করানোর প্রস্তাব দিতেন আনোয়ার। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক উভয় ধাপে ১০–১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে তাদের দাবি।

তাদের ভাষ্যমতে, পুরো কার্যক্রমটি ছিল সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর। পরীক্ষাকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নোত্তর আদান-প্রদানের অভিযোগও রয়েছে। এ কারণেই একটি অংশের কাছে তিনি ‘প্রক্সি ডন’ ও ‘ডিভাইস ডন’ নামে পরিচিত ছিলেন।

২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর ‘ডি’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রেসিডেন্স, হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন কমিটি তার মাস্টার্স পরীক্ষার সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিনি কারাবন্দিও ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় একটি শক্তিশালী প্রক্সি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও ছিল।

কারামুক্তির পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে পুনরায় সক্রিয় হন আনোয়ার, এমন অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক সনদ ব্যবহার করে তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে জাতীয় বেতন স্কেল–২০১৫ অনুযায়ী ১৭তম গ্রেডে মেকানিক পদে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি হাটহাজারীতে কর্মরত হলেও চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার কেবি আমান আলী রোডে বসবাস করেন।

স্থানীয়দের দাবি, স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মচারী হয়েও তার জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রক্সি সিন্ডিকেটকে আরও বিস্তৃত করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অতীতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও বর্তমানে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার নামে নিউজ হলে অফিসে ব্যাখ্যা দিতে হয়, শোকজ হয়, অনেক খরচ হয়।” সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়া বা সহায়তা করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ হোসাইনী বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪১৯, ৪২০, ৪৬৫/৪৬৮, ৪৭১ ও ১২০বি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ীও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তার মতে, প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি প্রাপ্তি প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিলযোগ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সম্ভব।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও