বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

এভারকেয়ারের ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু; সুস্থ হয়ে ওঠা আলভি হঠাৎ কেন লাইফ সাপোর্টে?

আর ইউ
- Advertisement -bsrm

এভারকেয়ার হাসপাতাল—চট্টগ্রামের একটি সুপরিচিত বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, যাকে অনেকেই উচ্চ ব্যয়ের “অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে একই সঙ্গে এই হাসপাতাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা ও মতামত—কারও কাছে এটি উন্নত চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য জায়গা, আবার কারও কাছে ব্যয়বহুল সেবা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের জায়গা।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মহেশখালী এলাকার মো. সাহেদুছসাফা আলভির চিকিৎসা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসা প্রক্রিয়া, লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা ও প্রশ্ন। এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক।

আলভি গত ৫ এপ্রিল একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে ইমার্জেন্সি আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার পর ১১ এপ্রিল উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে স্থানান্তর করা হয়।

ভর্তির সময় রোগীর পরিবারের কাছ থেকে একটি এডমিশন ফরমে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ওই সময় রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল ছিল এবং লাইফ সাপোর্টের কোনো প্রয়োজনীয়তার কথা তাদের জানানো হয়নি। বরং ১১ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি লক্ষ্য করা যায়—যে দৃশ্যটি মোবাইলে ধারণ করে রেখেছিলেন রোগীর পরিবার। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৪ এপ্রিল পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। পরিবারের অভিযোগ, তাদের কোনো প্রকার অবগত না করেই আলভিকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় তিন লক্ষাধিক টাকার মোটা অংকের বিল।SIBL

এমন অভিযোগ পেয়ে বেশ কিছু গণমাধ্যমকর্মী ঘটনাস্থল এভারকেয়ার হাসপাতালে উপস্থিত হন এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. সৌরভের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। ডা. সৌরভ কোনোভাবে দেখা করবেন না বলে জানান এভারকেয়ার হাসপাতালের সিকিউরিটি ইনচার্জ।

তিনি অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান এবং প্রশ্নের জবাবে বলেন, সকল নিয়ম মেনেই রোগীকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল এবং রোগীর পরিবারের কাছ থেকে আগেই স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছিল বলে তিনি ১১ তারিখের এডমিশন ফরমটি দেখান। তবে ওই ফরমে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সৌরভের স্বাক্ষরের কোনো তারিখ উল্লেখ ছিল না। তিনি আরও বলেন, এ হাসপাতালে চিকিৎসা বিলের টাকা থেকে কখনো এক টাকাও কম নেওয়া হয় না, তবে এই রোগীর পরিবারকে ১০ শতাংশ বিল মওকুফ করা হয়েছে, যেটা এভারকেয়ার হাসপাতালে সম্ভবত এই প্রথমবার। লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় ১৪ তারিখ এবং রোগীর স্বজনদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় ভর্তির দিন তথা ১১ এপ্রিল, তখন লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত ছিল না এবং রোগীর পরিবারও লাইফ সাপোর্টে দিতে চায়নি। সেক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে আগাম স্বাক্ষর নিলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারেননি। তবে তার বক্তব্যের মধ্যেই তৈরি হয়েছে একাধিক অসঙ্গতি। যে এডমিশন ফরমে স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, তাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের স্বাক্ষরের পাশে কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। এছাড়া, ভর্তির দিন আগামভাবে লাইফ সাপোর্টের সম্মতি নেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যখন ওই সময় রোগীর অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল বলে পরিবার দাবি করছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা (পিআরও) মামুনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি সরকারি ছুটিতে রয়েছি। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সকল নিয়ম মেনেই রোগীকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে এবং ছুটির দিনে আপনাদের সাথে কথা বলতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সৌরভ বাধ্য নয়। আপনাদের যা জানার আছে পহেলা বৈশাখের পরের দিন জেনে নিয়েন অথবা আপনাদের ফোন নম্বর এবং মেইল দিয়ে যান, বিস্তারিত ঘটনা আপনাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে। এমন জবাবে গণমাধ্যমকর্মীরা পরের দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যের অপেক্ষায় থাকেন। তবে বেশ কয়েকদিন পার হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। মৃত্যুর কারণ, চিকিৎসা প্রক্রিয়া, এবং লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার সময়কার আনুষ্ঠানিকতা—সবকিছু ঘিরেই দেখা দিয়েছে রহস্যজনক ধোঁয়াশা।

উল্লেখ্য, এর আগেও একই হাসপাতালে চিকিৎসা সংক্রান্ত অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনাও চিকিৎসাজনিত গাফিলতির অভিযোগে আলোচনায় আসে।

বর্তমান ঘটনায় নিহত আলভির পরিবার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, পুরো বিষয়টি পরিকল্পিত গাফিলতি এবং এর সঠিক বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিবার একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতে পারে।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—উন্নত চিকিৎসার নামে পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আদৌ কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে? নাকি উচ্চ ব্যয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে রোগীদের জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—এখন সেই উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও