কক্সবাজারে শিক্ষক নিয়োগ জালিয়াতি: ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে সামনে এসেছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সিপাহী আজিজুলের নাম
° নিয়োগ পরীক্ষার আড়ালে কোটি টাকার সিন্ডিকেট
° সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের অনুসন্ধানে নতুন এক বিস্ময়কর তথ্য সামনে এসেছে। কক্সবাজারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫-এ একজন প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মরত সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আমান উল্লাহ নাহিন (রোল নম্বর: ৪৬২১০৬৫)-এর পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন চকরিয়া উপজেলার কোরালখালী সাহারবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম (৩০)। তিনি মোজাম্মেল হকের পুত্র এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিপাহী পদে চাকরি করছেন।
একাধিক সূত্র বলছে, এটি কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত জালিয়াতি নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এই প্রক্সি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় অন্যের হয়ে অংশগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং আর্থিক চুক্তিনির্ভর।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) মেকানিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্লেখ্য, ‘সিভিশন’-এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ সামনে আসে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক অস্বস্তি তৈরি হয়। পরে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনকে হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে বদলি করে কর্ণফুলী উপজেলায় পদায়ন করা হয়। তবে স্থানান্তরের পরও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের কার্যক্রম কেবল একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই), সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৬, ১৭ ও ১৮তম গ্রেডের চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত এলাকার সরল ও উচ্চাভিলাষী চাকরিপ্রার্থীদের, বিশেষ করে মাদক ব্যবসায়ীর পরিবারের সদস্যদের, টার্গেট করা হয়। চাকরি নিশ্চিত করার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি করা হয়।
এরপর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল এসব শিক্ষার্থীর মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করার চেষ্টা চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই পদ্ধতিতে অযোগ্য ও মেধাহীন ব্যক্তিদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চক্রটির সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন সুস্পষ্ট। কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করেন, কেউ আর্থিক লেনদেন ও চুক্তি সম্পন্ন করেন, কেউ প্রক্সি পরীক্ষার্থী নির্বাচন করেন এবং কেউ পুরো অপারেশনের সমন্বয় করেন। ফলে পুরো নেটওয়ার্কটি বহুস্তরবিশিষ্ট ও গোপনীয় কাঠামোয় পরিচালিত হয়ে আসছে।
‘সিভিশন ’-এর হাতে থাকা তথ্য বলছে, বহু বছর ধরে পরিচালিত এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণ ইতোমধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে।
চক্রটির তৎপরতার ব্যাপকতা সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যানবাহন শাখার ‘পরিদর্শক’ পদে নিয়োগ পরীক্ষাতেও অন্য এক প্রার্থীর হয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার জালিয়াতির পাশাপাশি একই দিনে তিনি আরেকটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায়ও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে কাস্টমসের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, কীভাবে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিতে পারেন, এ প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে সম্পদের অসঙ্গতির বিষয়। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তাদের জীবনযাপনেও দৃশ্যমান হয়েছে অস্বাভাবিক বিলাসিতা।
‘সিভিশন’-এর হাতে ইতোমধ্যে ব্যাংক হিসাবের খতিয়ান, বেনামে কেনা জমির দলিল এবং সম্পদ-সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি এসেছে। এসব তথ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কয়েক বছরের ব্যবধানে অভিযুক্তদের আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন এলাকায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে তাদের দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু পরীক্ষা জালিয়াতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতারণা, পরিচয় গোপন, জালিয়াতি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগও প্রযোজ্য হতে পারে।”
তিনি বলেন, “প্রক্সির মাধ্যমে সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যও ক্ষতিকর।”
শিক্ষা ও সুশাসন বিষয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেকানিক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “এসব কাজ এখন আমি আর করি না। মান-সম্মান যা ছিল, তা আপনার নিউজের কারণে চলে গেছে। এখন বাকি জীবন আল্লাহ আল্লাহ করে কাটাতে চাই।”
অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, “আমাকে ধরে লাভ কী? আমি অল্প টাকা পাই, ছোট মানুষ। আপনি বড় ভাই আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলেন, তিনি সব জানেন।”
পরে তিনি আরও বলেন, “আমাদেরকে না ধরে রাঘববোয়ালদের ধরেন।”
তবে সেই ‘রাঘববোয়াল’ কারা, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

