বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৯, ২০২৬

প্রকল্পের অর্থ লোপাট করছেন সিডিএ কর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
- Advertisement -bsrm

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প’ এর পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রতি মাসের বেতন নেন সিডিএ থেকে আর বেতনের ৪০ শতাংশ হারে ভাতা নেন প্রকল্প থেকে। তিনি বেতন নেন প্রায় ৬৩ হাজার টাকা আর ভাতা নেন ২৫ হাজার টাকা। চাকরিবিধি অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি ভাতা নিতে পারেন না। শুধু তিনিই নন, আরও কয়েকজন কর্মকর্তা সিডিএ থেকে বেতন আর প্রকল্প থেকে ভাতা নেন।

অভিযোগ উঠেছে, তারা জালিয়াতির মাধ্যমে দুই জায়গা থেকে বেতনভাতা নিয়ে সরকারি অর্থ লোপাট করছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পে জনবল নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সিডিএর বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার আর্থিক সহায়তায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৭০৬০৩ (লাখ টাকায়) টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় জানুয়ারি ২০১১ থেকে জুন ২০২০। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে। পরে সিডিএর উপ-সচিব অমল গুহকে প্রকল্পের চিফ রিসেটেলমেন্ট অফিসার এবং সিডিএর টাউন প্ল্যানার জহির আহম্মদকে প্রকল্পের চিফ এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অফিসার নিয়োগ করা হয়। প্রকল্পটিতে সিডিএর মোট সাতজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট এ অনিয়ম-দুর্নীতি করে। তারা ভাতার নামে প্রকল্পের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।SIBL

প্রকল্পের পিডিসহ বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। জনবল নির্ধারণ বিষয়ক কমিটির সুপারিশ ছিল প্রকল্পের পিডিকে প্রেষণে পূর্ণকালীন নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু এটি মানা হয়নি বরং সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামসকে পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি একই সঙ্গে সিডিএ ও প্রকল্প দুটোতেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সিডিএ থেকে বেতন ও প্রকল্প থেকে ভাতা নিচ্ছেন।

বেতনভাতা গ্রহণের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কাজী হাসান বিন শামস সিডিএ থেকে মাসে বেতন নিয়েছেন ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা। আর প্রকল্প থেকে ভাতা হিসেবে বেতনের ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ২৫ হাজার ৩১২ টাকা নিয়েছেন। সিডিএর উপ-সচিব অমল গুহ সিডিএ থেকে বেতন নিয়েছেন ৬০ হাজার ৮৪০ টাকা এবং প্রকল্পের চিফ রিসেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে প্রকল্প থেকে ভাতা নিয়েছেন ২৪ হাজার ৩৩৬ টাকা। সিডিএর টাউন প্ল্যানার জহির আহম্মদ সিডিএ থেকে বেতন নেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের চিফ এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অফিসার হিসেবে ভাতা নিয়েছেন ২১ হাজার ৪৪৪ টাকা করে। সিডিএর অর্থ ও হিসাবরক্ষণ অফিসার মোহাম্মদ নাজের ২৪ হাজার ৩৩৬ টাকা প্রকল্পভাতা হিসেবে নিয়েছেন, সহকারী প্রকৌশলী রাজিব দাম ১৭ হাজার ২৬৮ টাকা, এটিপি সাইয়েদ ফুয়াদুল খলিল-আল-ফাহমী ১৬ হাজার ৪৪৪ টাকা ও বাজেট অফিসার মো. আনিসুল হক পাটোয়ারী ৯ হাজার ৭০৪ টাকা নিয়েছেন। এ ৭ জন কর্মকর্তা ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রকল্প থেকে ভাতা হিসেবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৪ টাকা নিয়েছেন। তারা বছরের পর বছর ধরে এ কায়দায় সিডিএ থেকে বেতন ও প্রকল্প থেকে ভাতা নেন।

চাকরির বেতনভাতা আদেশ ২০১৫-এর ৩২ ধারা অনুযায়ী, প্রেষণে নিয়োজিত কর্মচারী মূল বেতনের ২০ শতাংশ প্রেষণভাতা ২০১৫ সালের ১ জুলাই বিলুপ্ত হয়েছে। তবে বিধির ২২ ধারা অনুযায়ী চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মচারীরা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে প্রাপ্য হবেন। তবে এ ভাতা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি হবে না। অথচ সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাতা নিচ্ছেন, আর অন্য কর্মকর্তারা ১০ থেকে ২৪ হাজার টাকার বেশি নেন। এটা সরকারি টাকা আত্মসাতের শামিল।

জনবল নিয়োগে অনিয়ম

প্রকল্পটিতে জনবল নিয়োগেও অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১০ সালে অর্থ বিভাগ থেকে ৪৯ জন কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। শর্ত ছিল প্রকল্পের জনবল সরাসরি, প্রেষণে ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। কিন্তু এ শর্ত মানা হয়নি।

নথিপত্রের তথ্যমতে, ২০১০ সালের ৫ আগস্ট অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) রণজিত কুমার চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প’ বাস্তবায়নের পর্যায়ে ৪৯টি পদ কয়েকটি শর্তে ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। এসব জনবল প্রেষণে, সরাসরি ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আরেক সভায় ৮টি পদ তিনটি শর্তে ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে— সুপারিশকৃত পদে জনবল নিয়োগে প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান যথাযথ পালন করতে হবে; সরাসরি নিয়োগের জন্য সুপারিশকৃত পদে বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে ও উপর্যুক্ত পদগুলো ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সিডিএর তথ্য বলছে, সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। এরপর তাকে পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবদুচ সালাম সিডিএর চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল সিডিএর উপসচিব অমল গুহকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের চিফ রিসেটেলমেন্ট অফিসার ও সিডিএর টাউন প্ল্যানার জহির আহম্মদকে চিফ এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অফিসার পদে নিয়োগ দেন। যদিও জনবল নির্ধারণ বিষয়ক কমিটির সুপারিশ ছিল চিফ রিসেটেলমেন্ট অফিসার পদে সরাসরি নিয়োগ দিতে হবে, কিন্তু সে পদে সিডিএর একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নূরুল ইসলামকে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কাজী হাসান বিন শামস চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে দিয়ে প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের আদেশ বাতিল করানো হয়।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও