যানজটমুক্ত সড়ক ও ফুটপাতে সাধারণ মানুষের চলাচল নিশ্চিত করতে তিনপুলের মাথা থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত অবৈধ হকার উচ্ছেদ করেছিল সাবেক সিটি মেয়র রেজাউল করিম। এরপরও পুরোপুরি হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ভাসমান হকাররা।
নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে হকার্স সমাজ ও হকার্স ইউনিয়ন নামে দুটি সংগঠন। দুটি সমিতির নেতারা বিগত ১৭ বছর হকার্স লীগ নামে একটি সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করতেন। সরকার পতনের পর হকার্স লীগ নাম বিলুপ্ত করে একই ব্যক্তিরা ভিন্ন নামে সমিতি গঠন করেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মো. মহিম নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে বিএনপি সমর্থিত কর্মচারী শ্রমিক দলের নেতা মোহাম্মদ সেলিমের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। মহিম নিজেকে দোকানের কর্মচারী দাবি করলেও গোলাম রসুল মার্কেটে ভাই ভাই কার্পেট নামে তার একটি দোকান রয়েছে।
নগরের তিনপুলের মাথা থেকে স্টেশন রোড। আধা কিলোমিটারের এ জায়গায় সড়কের পাশে ভাসমান হকারের চৌকি রয়েছে অন্তত এক হাজারের বেশি। এসব হকারের কাছ থেকে মাসে বিভিন্ন ধাপে চাঁদা তোলা হয় প্রায় ‘৫০ লাখ টাকা’। সিটি কর্পোরেশন নয়-এসব চাঁদা যায় শ্রমিক নেতা নামধারী কিছু ব্যক্তির পকেটে। এতদিন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চট্টগ্রাম হকার্স লীগ ভাসমান হকারদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর হকার্স লীগ নাম বিলুপ্ত করে হকার সমাজ নামে একটি সংগঠন তা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সমিতির আহ্বায়ক হলেন হকার্স লীগের সভাপতি প্রবীণ কুমার ঘোষ ও সদস্য সচিব হলেন কর্মচারী শ্রমিকদল নেতা মোহাম্মদ মহিম। গোলাম রসুল মার্কেটে নিজস্ব দোকান থাকলেও নিজেকে কর্মচারী পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে মহিম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন হকার জানান, তিনপুলের মাথা থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত হকার রয়েছে অন্তত এক হাজার। সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হকার্স লীগ নামে একটি সংগঠন এসব হকারদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। কল্যাণ ফান্ডের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজিও চলতো। সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন প্রবীণ কুমার ঘোষ ও সেক্রেটারি ছিলেন হারুনুর রশিদ। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর হকার্স লীগ নাম বিলুপ্ত করে হকার্স লীগের সহ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ও সেক্রেটারি হারুনুর রশিদ মিলে গঠন করেন হকার্স ইউনিয়ন।
হকার্স লীগের সভাপতি প্রবীণ কুমার ঘোষ ও মো. মহিম মিলে গঠন করেন হকার্স সমাজ নামে আরেকটি সংগঠন। এ সংগঠন বিএনপি নেতাদের ছবি দিয়ে আমতল এলাকায় ব্যানারও টাঙিয়েছে। আবার হকার্স লীগ নাম বিলুপ্ত করায় শ্রম আদালতে মামলাও ঠুকে দেন প্রবীণ কুমার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন হকার জানান, ভাসমান হকারদের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। বিপুল সংখ্যক হকারদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। যারা হকার নেতা তারা কেউ হকার নয়। যেমন-বিগত সরকারের আমলে আমতল, মিউনিসিপ্যাল স্কুল, নিউ মার্কেট থেকে রেলস্টেশন ও স্টেশন রোডসহ পুরো এলাকায় ভিন্ন নামে পাঁচটি সমিতির নেতারা হকারদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতো। সবগুলো সমিতির নেতারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছিল। সরকার পতনের পর এসব সমিতির নাম বিলুপ্ত করে হকার্স ইউনিয়ন ও হকার্স সমাজ করা হয়। একই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিএনপি সমর্থিত মহিম নামেও ওই ব্যবসায়ী। সড়ক ও ফুটপাতে হকার বেড়েছে আগের চেয়ে তিনগুণ।
হকাররা জানান, যেমন-প্রতি চৌকি থেকে দিনে কল্যাণ ফান্ডের নামে তোলা হয় ১০ টাকা। এক হাজার দোকান হিসাবে মাসে চাঁদা তোলা হয় তিন লাখ টাকা। এর বাইরে চৌকি প্রতি প্রতিদিন ৩০ টাকা করে প্রতিমাসে তোলা হচ্ছে নয় লাখ। তাছাড়া বিদ্যুতের প্রতি বাল্বে নেওয়া হয় দিনে ৩০ টাকা। প্রতি চৌকিতে গড়ে অন্তত চারটি বাল্ব জ্বালানো হয়। সে হিসেবে দোকানপ্রতি একদিনে ভাড়া দিতে হয় ১২০ টাকা। এক হাজারে দোকানে মাসে ৩৬ লাখ টাকা তোলা হয়।
বিদ্যুৎ সংযোগ ১৩ মিটার থেকে: হকারদের বিদ্যুৎ সংযোগের উৎস মেট্রোপলিটন হকার্স সমিতির নামে ছয়টি, ফুটপাত হকার্স সমিতির নামে তিনটি, হকার্স লীগের নামে তিনটি, টেরিবাজার হকার্স সমিতির নামে একটিসহ মোট ১৩টি অস্থায়ী মিটার রয়েছে। এসব মিটার থেকে হকারদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

