·
নতুন বিয়ে হয়ে গ্রামে শশুড়বাড়ি এসে বউ হয়ে বসে আছি। পাড়ার মেয়ে, বউরা নতুন বউ দেখতে আসছে। আমিও ছোট করে হাসি দিয়ে, টুকটাক কথা বলছি। হঠাৎ দেখলাম চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ে আমাকে হা করে দেখছে। ভারী মিষ্টি চেহারা কিন্ত বেশভূষা কেমন যেন! মাথার চুল গুলো এলোমেলো শুষ্ক। ওকে দেখে সবাই সরে গেল,সবার ভেতর একটা তাচ্ছিল্যের ভাব।আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছোটো করে হাসি দিলাম, ও ফিক করে হেসে ওখান থেকে চলে গেল।
চাচাত ননদ সুমি বলে উঠল,
ভাবি ঐ মেয়েকে দেখে তুমি হাসলে কেন?
তাতে কি হয়েছে?
তুমি জানো? ও একটা পাগলী।
ছি সুমি, এভাবে বলে না আপু।ও আসলে মানসিক ভারসাম্যহীন।।
ভাবি ওসব খটমটে কথা বোলো না তো। ও হচ্ছে আমাদের গ্রামের জরিনা পাগলী।
মনটা খুব বিষন্ন হলো,আহারে ঐটুকু মেয়েকে সবাই কেমন পাগলী বলছে। কেউ ওর সাথে ভালো করে কথা বলে না।
পরদিন বিকেলে উঠানে বসে আছি, জরিনা এসে হাজির, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ঘর থেকে দুখানা বিস্কুট এনে ওর হাতে দিলাম। অবলা প্রাণীরা ভালোবাসা বোঝে আর ও তো একটা মানুষ, হোক পাগলী। ও বিস্কুট নেওয়ার সাথে সাথে আমার ভালোবাসাটাও লুফে নিলো।
আস্তে আস্তে বলল, তুই তো একদম কুটি মানুষ।
আমি তো হা, বলে কি! আমার বয়স আাঠারো আর ওর বয়স চৌদ্দ, আমাকে বলে কুটি!
আবারও বলে উঠল, তুই আমার কুটি বউ।
আমি হাসি দিয়ে সায় দিলাম। এরপর থেকে প্রতিদিনই ওর চাঁদমুখটা আমাকে দেখিয়ে যাবে। দিন সাতেক পর টুকটাক কাজ করছি।
জরিনা এসে বলল, কুটি বউ তুই দেখতে কি সুন্দর। সবসময় সেজে থাকিস, আমাকে একটু সাজিয়ে দিবি?
ঠিক আছে দেবো। তোর গায়ে তো অনেক ময়লা, সাবান দিয়ে গোসল করে আয়।
আমি ওর হাতে সাবান দিলাম, সত্যিই ও গোসল করে আবার আমার কাছে আসলো। আমি ওকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম। মেয়েটাকে খুব সুন্দর লাগছে। একটা আয়না দিয়ে বললাম, দেখ চিনতে পারছিস?
আয়নায় নিজেকে দেখে জরিনা অবাক, কুটি বউ এইটা আমি?
তুই না তো আর কে হবে?
সত্যিই আমি এটা?
হ্যাঁ রে তুই, ওর আনন্দ দেখে ভাবলাম একটা ছবি তুলি।ওকে নিয়ে স্টুডিওতে যেয়ে ছবি তুলে প্রিন্ট করে ওর হাতে দিই।সেই ছবি পেয়ে ওর যে কি আনন্দ, সারা গ্রামের মানুষকে ছবি দেখালো।
জরিনার একটাই সমস্যা ছিল, ওড়না ঠিক মতো গায়ে রাখতে পারতো না। আমি ওকে বোঝাতাম, সোনা ভালো করে গায়ে ওড়না দেও।
কুটি বউ আমার গরম লাগে।
লাগুক তাও দিতে হবে। আমি সেফটিপিন দিয়ে, ওর ওড়না আটকে দিই।
ভোরবেলা রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে যাবে। ওর মাকে বললাম, খালা মানুষ জন ভালো না, বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে সব পশু হয়ে গেছে। কোনদিন কি অঘটন ঘটবে, তুমি ওকে বেরোতে দেবে না।
মা রে ও কথা শোনে না, ভোর হলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
খালা তুমি ঘরের বাইরে থেকে দরজায় শিকল দিয়ে দেবে, আর বেলা হলে তারপর খুলবে।
একদিন দুপুর বেলা ভাত খেয়ে শুয়ে আছি, হালকা ঘুমের ভাব।হঠাৎ শুনি জরিনার গলা,
কুটি বউ তুই কোথায়? কেমন যেন কান্না মিশ্রিত গলা।
তন্দ্রা ছুটে গেল তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি, মেয়েটার কপড় চোপড় এলোমেলো সারা গায়ে ধুলা। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
কুটি বউ আমারে ব্যাথা দেছে, আমারে অনেক ব্যাথা দেছে।
ভাবলাম ওর মা মাঝে মাঝে মার দেয় আজ হয়ত বেশি মেরেছে।
আদর করে, গায়ের ধুলো ঝেড়ে হাতে কিছু বিস্কুট দিয়ে বিদায় করি।
ছয়মাস পর হঠাৎ জরিনাকে নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়। মাতৃতের সকল চিহ্ন জরিনার শরীরে স্পষ্ট।জরিনার মা দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল, বৌমা সর্বনাশ হয়েছে। হরামজাদি কোথা থেকে কি করেছে,তুমি যা পার করো
খালা শান্ত হও,আমি ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।
ডাক্তার দেখে বলল,ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এসময় কিছু করা যাবে না। কিছু করতে গেলে মেয়েটিকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে।
কি আর করবো জরিনাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসছি ,হঠাৎ আমার ঐ দিনের কথা মনে হলো।বেচারি আমার কাছে ঠিকই নালিশ করেছিল আমি বুঝতে পারিনি। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম
সোনা ঐ দিনের কথা তোর মনে আছে?
কোন দিনের কথা?
ঐযে আমার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসেছিলি।তোকে কে ব্যাথা দিয়েছিল বলতে পারবি?
কুটি বউ আমার কিছু মনে নেই
পাগল মানুষ ও কি কিছু মনে রাখতে পারে! আমিই কিছু বুঝতে পারিনি। তখন যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে শয়তানটাকে হয়ত ধরা যেত।মানুষ এত জঘন্য হয় এটা আমার মাথায় আসিনি। নিজের চুল নিজের ছিড়তে ইচ্ছা করছে।
একটা নিষ্পাপ পাগল মেয়ে তাকেও ছাড় দিল না! কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্য, বিবেক বুদ্ধি সব জলাঞ্জলি দিয়ে, মানুষ এত খারাপ কাজ করতে পারে! লোভী জানোয়ারের স্বীকার চার বছরের শিশু পর্যন্ত হয় আর এ তো চৌদ্দ বছরের মেয়ে। হোক সে পাগল তবুও তো মেয়ে। এরা মনুষ্যত্ব সব হারিয়ে ফেলেছে। এসমস্ত লোভী পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় মেয়েরা পশর সাজিয়ে বসে আছে, সেখানে না যেয়ে এসমস্ত অসহায় মেয়েদের উপর অত্যাচার কেন?
জরিনাকে নিয়ে গ্রামের লোকেরা অনেক বাজে বাজে কথা বলে বেড়াই। সবাই ভুলে গেল ও একটা পাগলী।
ছেড়ির দেখে মনে হয় পাগলী, তলে তলে তো ঠিকই আছে। পাগলী কিছু বোঝে না এদিকটা তো ভালোই বুঝেছে।নানান কথা।
মনে হচ্ছে ওরই যত দোষ। সবসময় যারা ধর্ষিত হয় তাদেরই দোষ, আর যারা জঘন্য কাজটা করে তারা পার পেয়ে যায়।
জরিনার মা লোকের কথা সহ্য করতে পারে না, জরিনাকে ধরে মার দেয়। আমি ওর মাকে বুঝায়, খালা এইটা তুমি কি করো? ওরে মার কেন?
ওর জন্যই তো এত কিছু, গ্রামের লোক ওকেই দোষ দেয়।
খালা ও কি সুস্থ না এসব কিছু বোঝে?
মানুষজন তো, তা মানে না। আমি আর পারছি না বৌমা, মনে হচ্ছে বিষ কিনে এনে ওর মুখে ঢেলে দিই।আপদ বিদেয় হোক। এত মানুষ মরে ও মরে না কেন?
ছি খালা এ সব বলে না। মানুষজন যা বলে বলুক তোমার মেয়ে তুমি তো বুঝবা।পাগলী মেয়ে, লোভী মানুষের স্বীকার ওর দোষ কোথায়?
এভাবে আরও কিছু দিন কেটে গেল।
নির্দিষ্ট দিন জরিনার প্রসব বেদনা শুরু হলো।
খালা দৌঁড়ে আমার কাছে এসে বলল,
মারে জরিনা কেমন করছে।
চিন্তা কোরো না খালা,আমি ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
হাসপাতালে যাওয়ার পর জরিনার একটা ফুটফুটে ছেলে হলো। কিন্তু জরিনার অবস্থা খুব খারাপ, প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। ওর গ্রুপের রক্ত ও নেগেটিভ। হাসপাতালে নেই, কোনোভাবেই জোগাড় করা যাচ্ছে না। আমি দিশাহারা হয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমার এক পরিচিতর এই গ্রুপের রক্ত। তাকে ফোন করলাম জীবন বাঁচাতে যেন একটু রক্ত দান করে। সব শুনে সে কিছুতেই রক্ত দিতে রাজি হলো না। এক পাগলীকে রক্ত দিতে পারবে না। আমার কষ্টে বুক ভেঙে যেতে লাগলো। আমার চোখের সামনে মেয়েটা মারা যাচ্ছে আর আমি অসহায় চোখে দেখছি।পায়ে পায়ে ওর কাছে যেয়ে দাঁড়ালাম। জরিনার মুখ চোখ সব সাদা হয়ে গেছে। ফ্যাকাশে দুটো ঠোঁট নেড়ে আমাকে কিছু বলতে চাইছে।মুখের উপর ঝুকে শোনার চেষ্টা করলাম।
কুটি বউ আমার ছেলেটাকে তোর কাছে রাখিস।
আমি অবাক! একটা পাগলী মারা যাচ্ছে, তবুও তার সন্তানের কথা ভাবছে।
রাখবো সোনা, তুই ভালো হয়ে যাবি।হালকা একটা হাসির রেখা জরিনার ঠোঁটে ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। জরিনা মারা গেল।
ছোট্ট শিশু বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।
পরিবার থেকে প্রচন্ড আপত্তি উঠল। কিছুতেই বাচ্চা আমার কাছে রাখতে দেবে না। সবাই খুব বকাবকি করলো, আমি যেন এই মূহুর্তে আপদ বিদায় করি। অগত্যা বাচ্চা নিয়ে জরিনার মায়ের কাছে নিয়ে যেয়ে বললাম,খালা বাচ্চাটা তোমাদের কাছে রাখো। আমি মাঝে মধ্যে টাকা দেবো।
না গো বৌমা মেয়েটা মরে গেছে। ও আমি রাখতে পারবো না। পারলে কোন এতিমখানায় রেখে এসো।
বাধ্য হয়ে আমি জরিনার ছেলেকে এতিমখানায় রেখে এসেছি। জরিনার দেয়া কথা আমি রাখতে পারিনি। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়।
মাঝে মাঝে চুরি করে ছেলেটাকে দেখতে যাই। ইচ্ছা আছে যখন ও একটু বড়ো হবে, তখন আমাকে কুটি মা বলে ডাকতে বলব।

