চট্টগ্রাম নগর পুলিশ তালিকাভুক্ত সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে জেলার রাউজান ও নগরের বিভিন্ন এলাকায় ‘সচেতনতামূলক’ মাইকিং করায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তার স্ত্রী তামান্না শারমিন। সাজ্জাদকে ‘কোরবানির গরুর মতো’ রশি দিয়ে বেঁধে রাস্তায় ঘোরানো মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং অপমানজনক বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় এসব বলেন তিনি।
গত ১৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং মল থেকে সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেন লোকজন। এর আগে ২৯ জানুয়ারি তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেন নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ফেসবুক লাইভে এসে পেটানোর হুমকি দিয়েছিলেন সাজ্জাদ। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ ১৫টি মামলা রয়েছে।
সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের পরপরই গত ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে ‘ব্রাশফায়ার’ করেন তার অনুসারীরা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় একজনের, আহত হন আরও দুজন। নিহত ও আহতরা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলার অনুসারী। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের একজন বখতিয়ার হোসেনের মা ফিরোজা বেগম গত মঙ্গলবার বাকলিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় সাজ্জাদ, তাঁর স্ত্রী তামান্না শারমিনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্য পাঁচ আসামি হলেন মো. হাছান, মোবারক হোসেন, মো. খোরশেদ, মো. রায়হান ও মো. বোরহান।
সবশেষ গত ৬ এপ্রিল নগরের চান্দগাঁও থানার ইট ও বালু ব্যবসায়ী তাহসীন হত্যা মামলায় দ্বিতীয় দফায় সাজ্জাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ডে থাকা এই আসামিকে নিয়ে গত ৬ এপ্রিল রাতে জেলার রাউজান উপজেলার কদলপুর এবং ৭ এপ্রিল নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন এলাকায় রাস্তায় হাঁটিয়ে মাইকিং করে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, চান্দগাঁও থানা পুলিশ এবং পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজমের সোয়াট সদস্যরা সাজ্জাদকে ঘিরে হাঁটছেন। হাতকড়া পরা ‘ছোট সাজ্জাদের’ গায়ে ভেস্ট ও মাথায় হেলমেট।
পুলিশের একজন হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘সন্ত্রাসী ও ত্রাস ছোট সাজ্জাদকে সিএমপি কমিশনার স্যারের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে কোনো সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। আপনাদের এলাকায় যদি কোনো সন্ত্রাসী নাড়াচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে ছোট সাজ্জাদের মতো তাদের পরিণতি হবে।’
এদিকে হাতকড়া হাতে আসামিকে নিয়ে পুলিশের ‘সচেতনতামূলক’ মাইকিংয়ের ঘটনায় নগরবাসী মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অনেকে বিস্মিত হয়ে বলছেন, রিমান্ডে থাকা আসামিকে এনে প্রকাশ্যে মাইকে ঘোষণা দিয়ে তার সহযোগীদের ধরা কিংবা অস্ত্র উদ্ধার বা অস্ত্র ভাণ্ডারের সন্ধান করা হাস্যকর ঘটনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, রিমান্ডে আসামিকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনের জন্য যেমন, কার কাছে অস্ত্র আছে, কে অর্থ দেয়, নেপথ্যে কে কে ইত্যাদি জানার বিষয় আছে। তবে, মাইকিং করে আসামিকে প্রদর্শন এমন নজির নেই।
সাজ্জাদকে হাতকড়া পড়িয়ে এলাকা ঘোরানোর ভিডিও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ভাইরালের পর তার স্ত্রী তামান্না শারমিন গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর আজ সন্ধ্যায় দেওয়া এক মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘কোনো জায়গায় কি নজির আছে একজন রিমান্ডের আসামিকে গরুর মতো রশি বেঁধে এলাকায় এলাকায় মাইকিং করার? জিরো টলারেন্স ঘোষণা করতেছে ওসি আরিফ। আমার স্বামী কি কোরবানের গরু? আমার স্বামীকে এভাবে নিয়ে মাইকিং করতেছে!’
মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আসলে ওর (সাজ্জাদ) ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, ওর জন্য কথা বলার কেউ নাইতো; আমিও মেয়ে মানুষ—দুই তিনটা মামলা দিয়ে বসে আছে। এখন আমি আপনাদের ওপর ছেড়ে দিছি। আপনাদের কি মনে হয়, এটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে না? আমার স্বামীকে এভাবে গরুর রশি দিয়ে বেঁধে এলাকায় এলাকায় নিয়ে গিয়ে অপমানি করা হচ্ছে, কেন? আমি আপনাদের কাছে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।’
ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী যদি অপরাধী হয় তার বিচার আদালত করবে। ওসি আরিফ আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে নাই। আমার স্বামীকে সূচি গ্রেপ্তার করিয়েছে—এটা আমি বারবার বলেছি। বসুন্ধরা সিটিতে আমরা ঘুরতে গেছি, ওই অবস্থায় সূচি আমার স্বামীকে দেখে সিকিউরিটি রুমে নেওয়ার তিন ঘণ্টা পর পুলিশ আমাকে ও আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে। আমি পরে ছুটে আসি।’
‘আমার স্বামী যখন তামান্না তামান্না বলে চিৎকার করছিলো, তখন আমার মোবাইল হারিয়ে যাওয়ায় পাঁচ মিনিটের জন্য নিচে নামছিলাম। একসাথেই গ্রেপ্তার হয়েছি। ওসি আরিফ বা সিএমপির কমিশনার আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেনায়। কিন্তু ওরা সিম্পেথি (সহানুভূতি) নেওয়ার জন্য আমার স্বামীকে রাস্তায় নামিয়ে আমার স্বামীকে গুলি করে মারতে পারতেছে না?’ বলেন তিনি।
ঢাকায় ধরা পড়ার আগে সাজ্জাদ রাউজানের পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন। তার দলের কাছে একাধিক দেশীয় প্রযুক্তিতে বানানো অস্ত্র এবং বিদেশি অস্ত্র ও গুলি আছে, যা দিয়ে তারা ত্রাস সৃষ্টি করছে। তবে সাজ্জাদকে নিয়ে পুলিশ জেলার রাউজান ও ও নগরে ‘অভিযান’ চালিয়েও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি।

